আবদুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসন বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে প্রথমবারের মতো এখানে জয়ী হতে চায় জামায়াতে ইসলামী।
এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৮ হাজার ১৬ জন। দুই উপজেলায় ১০৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে উখিয়ায় ৪৭টি ও টেকনাফে ৬০টি অবস্থিত।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী। তাঁকে প্রার্থী ঘোষণার পর দলের একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে একাধিক কর্মসূচি ও আন্দোলন হয়েছে।
বিএনপির বিরোধকে সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াত। মাঠে নেমেছেন দলটির কক্সবাজার জেলা কমিটির আমির ও টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চারবারের চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারী। দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা, সংগঠনের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং সক্রিয় মাঠপর্যায়ের কর্মী সমর্থনকে পুঁজি করে তিনি বিএনপির সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন। জামায়াত নেতৃত্বের লক্ষ্য, বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে যে পরিচয় আসনটির রয়েছে, তা ভেঙে প্রথমবারের মতো জয়ী হওয়া।
এখানে আরও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা নুরুল হক, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) সাইফুদ্দিন খালেদ ও লেবার ডেমোক্রেটিক পার্টির আব্দুল্লাহ আল আরাফাত। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ আসনে মূল লড়াই গড়াবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই।
অতীতের নির্বাচন
কক্সবাজার-৪ আসনটি উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে গঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। আগে রামু, উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে এটি ছিল চট্টগ্রাম-১৮ আসন। এই আসনে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী। তিনি চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হন ৩৬ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে; তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী (৩৩,১৭৬ ভোট)। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও জয়ী হন শাহজাহান চৌধুরী। ওই বছরের সপ্তম সংসদের জুনের নির্বাচনে ৪৪ হাজার ৭০৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী; শাহজাহান চৌধুরী পান ৩০ হাজার ৫৯৪ ভোট। ২০০১ সালে শাহজাহান চৌধুরী জেতেন ৮৯ হাজার ৭৪৭ ভোট পেয়ে; আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী পান ৪৮ হাজার ৭৩৫ ভোট।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুর রহমান বদি জেতেন ৬৫ হাজার ৫৪২ ভোট পেয়ে। শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছিলেন ৩২ হাজার ৩১৮ ভোট। ২০১৪ সালেও সংসদে যান আব্দুর রহমান বদি। ২০১৮ সালে বদির কাছে (১,০৩,৬২৬ ভোট) হেরে যান শাহজাহান চৌধুরী (৭৯,৩১০ ভোট)। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বদির স্ত্রী শাহিনা আক্তার আওয়ামী লীগের হয়ে বিজয়ী হন। নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, আসনটিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসছে।
রোহিঙ্গা-মাদকই প্রধান ইস্যু
সীমান্তের ওপারে দফায় দফায় সংঘর্ষ, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও মাদকের কারবারই স্থানীয় জনগণের কাছে প্রধান ইস্যু। ২০১৭ সাল থেকে উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থান করছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। কয়েক বছর ধরে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা সরকারের সংঘাত চলছে। ফলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ থেমে নেই।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকট তাদের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নির্বাচন সামনে রেখে তারা জানতে চাইছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয়দের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে প্রার্থীদের স্পষ্ট অবস্থান কী।
ছাত্রনেতা আব্দুর রহমান ওরফে হাসেমির ভাষ্য, ‘মাদক শুধু তরুণ সমাজ ধ্বংস করছে না, ব্যবসা-বাণিজ্যও অনিরাপদ করে তুলছে। আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যিনি এই বিষয়টা শক্ত হাতে ধরবেন।’ উখিয়া ও টেকনাফে পর্যটন সম্ভাবনা থাকলেও স্থানীয়দের বড় অংশ এখনও কর্মসংস্থানের অভাবে ভুগছেন। সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানির সংকট নিত্যদিনের বাস্তবতা।
টেকনাফের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু এত বছরেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। নির্বাচিত এমপির কাছে আমাদের প্রথম দাবি এটার কার্যকর সমাধান। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইয়াবা কারবার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’
মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ থাকলেও তা কেটেছে বিএনপিতে। মনোনয়নবঞ্চিত মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘আমি মনোনয়ন চেয়েছিলাম, দল আমার নেতা শাহজাহান চৌধুরীকে যোগ্য মনে করে মনোনয়ন দিয়েছে, এটাই দলের সিদ্ধান্ত। আজ কোনো দূরত্ব নেই, আমরা ঐক্যবদ্ধ। এটি বিএনপির ঘাঁটি। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ধানের শীষকে বিজয়ী করা।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, ‘দেশের সীমান্তবর্তী এই আসনটি নানা অপরাধ আর অনিয়মের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এর মূল কারণ সুশাসনের অভাব। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ইনসাফভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’ রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা আমাদের ভাই, কিন্তু তাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান স্থানীয় মানুষের জন্য সংকট তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।’ মাদক, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই তাঁর দলের রাজনীতি।
বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের সব চাপ স্থানীয় মানুষের ওপর গিয়ে পড়েছে, অথচ তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয়নি। আমি নির্বাচিত হলে প্রথম কাজ হবে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো।’ মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দল-মত নির্বিশেষে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকার মানুষ কর্মসংস্থান চায়, ভিক্ষা নয়। পর্যটন, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলে স্থানীয় যুবকদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করার আশ্বাস দেন তিনি।###
উপদেষ্টা সম্পাদক : জহির আহমদ, টেকনাফ উপজেলা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার।
অফিস : আবু সিদ্দিক মার্কেট, টেকনাফ, কক্সবাজার।
মোবাইল : ০১৯০৭-৭৫৮২৫০, ০১৮৫১-৯২৯৬৫৮
Developed By : AzadWebIT.Com